ঢাকা, বুধবার, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬, ২৬ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মহাসাগরের ১৪ রহস্য (শেষ পর্ব)

স্বপ্নীল মাহফুজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-২৭ ৮:১২:১৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৪-২৭ ১:২১:৫০ পিএম
ইয়োনাগুনি মনুমেন্ট
Walton AC 10% Discount

স্বপ্নীল মাহফুজ : রহস্য কোথায় নেই বলুন। মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর স্থলভাগ কিংবা জলভাগ সবখানেই রহস্য ছড়িয়ে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা কোনো রহস্যের সন্ধান পেলেই তা উন্মোচনের চেষ্টা করেন। কিন্তু শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক রহস্য উন্মোচিত হয় না। পরিসংখ্যান বলছে যে, আমরা মহাশূন্য সম্পর্কে যতটা জানি তার তুলনায় অনেক কম জানি মহাসাগর সম্পর্কে। মহাসাগরের রহস্য নিয়ে দুই পর্বের প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে ৭টি রহস্য তুলে ধরা হয়েছিল। আজ শেষ হর্বে থাকছে আরো ৭টি রহস্য।

* ব্লুপ সাউন্ড
১৯৯৭ সালে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের পানির নিচ থেকে রহস্যময় ব্লুপ সাউন্ড রেকর্ড করা হয়। অতি কম ফ্রিকোয়েন্সি ও উচ্চ কম্পাঙ্কের এ শব্দের ছিল অনন্য প্যাটার্ন, একারণে অনেকে মনে করেছেন যে এ শব্দটি মহাসাগরের গভীরে লুকায়িত কোনো প্রাণীর কাছ থেকে আসছে। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর এ শব্দের উৎপত্তি নির্ণয় করতে গবেষণা করেছেন। ২০০৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত একটি ঘোষিত তত্ত্ব হলো, এটি ছিল বরফ ভাঙনের শব্দ, যখন গ্লেসিয়ার (কোনো স্থানে অব্যাহতভাবে বরফ জমে যে অগলিত স্তূপের সৃষ্টি হয় তাকে গ্লেসিয়ার বলে) ভেঙে আইসবার্গে পরিণত হয়। সাধারণভাবে এ তত্ত্ব স্বীকৃত পেলেও কিছু বিজ্ঞানীদের ভিন্ন তত্ত্ব এ ব্যাখ্যার গুরুত্ব কমিয়েছে।

* অমরণশীল জেলিফিশ
এ ক্ষুদ্র জেলি কি ক্যানসার নিরাময়ে সাহায্য করবে? ফেকাশে লাল নখের চেয়েও ছোট এ সামুদ্রিক প্রাণীটি অনাহার বা ইনজুরিতে জীবনাশঙ্কার সময় বেনজামিন বাটনের মতো পলিপ স্টেজে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। মৃত্যুকে এড়িয়ে যাওয়ার এ অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কারণে এ প্রাণীটি নাম পেয়েছে ইম্মরটাল জেলফিশ বা অমরণশীল জেলিফিশ। মানুষ শত শত বছর ধরে এ প্রাণীটিকে চিনলেও বিজ্ঞানীরা তাদের এ অবিশ্বাস্য ক্ষমতা সম্পর্কে ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত জানতে পারেননি। বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানেন না যে, এ প্রাণীর কোষসমূহ কিভাবে অপরিণত ও পরিণত পর্যায়ে ফিরে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে এটি মানুষের ক্যানসার জয়ে অবদান রাখতে পারে।

* বারমুডা ট্রায়াঙ্গল
অতি পরিচিত বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের পয়েন্টগুলো হলো মিয়ামি, পুয়ের্তো রিকো ও বারমুডা। কিন্তু এসব গন্তব্যে কোনো ট্রিপ বুক করলে দুশ্চিন্তিত হবেন না, যদি আপনি বিপজ্জনক জলসীমায় না যান। এ অঞ্চলটি অপ্রত্যাশিতভাবে জাহাজ ও বিমান গায়েব করে দেওয়ার জন্য পরিচিত পেলেও আসলে কোনো প্রমাণ নেই যে এটি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অধিক বিপজ্জনক অথবা বিজ্ঞানীরা এটাও প্রমাণ করতে পারেননি যে সেখানে অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটানোর মতো কিছু রয়েছে। কিন্তু ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) মেনে নিচ্ছে যে সেখানে কোনোকিছু উধাও হওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে হারিকেনের কথা বলা যায়, হারিকেন হলো উপসাগরের স্রোত ও ক্যারিবিয়ানের বিভিন্ন দ্বীপের কারণে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনে সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়, একারণে সেখানে যান চালানো কঠিন। এনওএএ এটাও স্বীকার করছে যে এ অঞ্চলে নেভিগেশনাল টুলস বা আকাশযান-নৌযানের যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে যেতে পারে, এর কারণ হতে পারে ওশানিক ফ্লেটিউলেন্স। যখন মহাসাগরের তলদেশ থেকে বিশাল পরিমাণে মিথেন গ্যাস নিঃসরণ হয়, তখন মহাসাগর খুব হিংস্র হয়ে যায় ও সেখানে শূন্যগর্ভ সৃষ্টি হয়। এ অবস্থাকে বলে ওশানিক ফ্লেটিউলেন্স বা মহাসাগরীয় শূন্যগর্ভ। কোনো জাহাজকে ডুবানোর জন্য মহাসাগরের এ শূন্যগর্ভই যথেষ্ট। এছাড়া মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে মিশে যাওয়ার কারণে এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে চাওয়া আকাশযানের ইঞ্জিন অতি ঘনত্বের মিথেন গ্যাসের সংস্পর্শে এসে বিকল হয়ে যেতে পারে। ফলাফল কি আর বলতে হবে?

* মারিয়ানা ট্রেঞ্চ
গুয়ামের নিকটবর্তী মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ অংশের মহাসাগরের এ স্থানটি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর বিন্দু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মারিয়ানা খাতের দূরত্ব প্রায় সাত মাইল বা ১১ কিলোমিটার। তুলনা করতে চান? তাহলে জেনে রাখুন যে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ৫.৫ মাইল। মাত্র তিনজন ব্যক্তি মারিয়ানা খাত পরিদর্শনে গিয়েছিলেন: ১৯৬০ সালে দুজন সমুদ্রবিজ্ঞানী এবং ২০১২ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা/সমুদ্র বিচরণকারী জেমস ক্যামেরন। জেমস ক্যামেরনের অভিযানটি ছিল প্রথম একক অভিযান। জায়গাটি সম্পূর্ণ অন্ধকার, তাপমাত্রা মাত্র কয়েক ডিগ্রি, কিন্তু শূন্য ডিগ্রির ওপরে ও প্রতি বর্গকিলোমিটারের আট টনের তীব্র চাপ। কিন্তু এমন পরিবেশেও এ তিন অভিযাত্রী জীবন রক্ষা করতে পেরেছিল। এ অনন্য ইকোসিস্টেম সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এমনকি এটি খুব দূরে হলেও দূষণ থেকে মুক্ত নয়। সম্প্রতি গবেষকরা এ জায়গাটির ডাটাবেজ থেকে সেখানে একটি প্লাস্টিক ব্যাগের প্রমাণ পেয়েছেন।

* জায়ান্ট ওয়ারফিশ
এগুলো কি প্রাচীনকালের সমুদ্র দানব হতে পারে? সাপের মতো দেখতে এ প্রাণীটি হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম হাড়যুক্ত মাছ। এটি ৫৬ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং ওজন হতে পারে ৬০০ পাউন্ড। যেহেতু এরা ৩,৩০০ ফুট গভীরে বাস করে, তাই জীবিত ওয়ারফিশ সম্পর্কে তেমন একটা জানা যায়নি। ২০১৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে দুটি মৃত ওয়ারফিশ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণামতে এদের মৃত্যুর কারণ হলো কোনো অশুভ শক্তি বা ভূমিকম্প। যেহেতু বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত ওয়ারফিশের প্রজাতি সংখ্যা জানেন না, তাই এ দুটি মৃত মাছ তাদের গবেষণায় সহায়ক হতে পারে, তাদের ডিএনএ নমুনা থেকে হয়তো জানা যাবে ওয়ারফিশের প্রজাতি সংখ্যা।

* ইয়োনাগুনি মনুমেন্ট
এগুলো কি মনুষ্য-নির্মিত সিঁড়ি ও পিরামিড যা কোনো ভূমিকম্পে ডুবে গেছে? অথবা এগুলো কি প্রাকৃতিক পাথুরে গঠন? জাপান অংশের জলাশয়ে অবস্থিত এসব অদ্ভুত গঠনের ডাকনাম হলো জাপান’স আটলান্টিস। ১৯৮৬ সালে একজন ডুবুরী জাপান’স আটলান্টিসের সন্ধান পান। তখন থেকে এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা দ্বিধার মধ্যে আছেন যে, এগুলো মানুষের তৈরি নাকি প্রাকৃতিক গঠন। ইয়োনাগুনি মনুমেন্টের খোদাই শিল্প ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এগুলো মনুষ্য-নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বর্তমানে এটি পর্যটকদের জন্য জনপ্রিয় ডাইভ স্পট। পর্যটকেরা পানির নিচে রহস্যাবৃত এ প্রাচীন নিদর্শন দেখে বিস্মিত হন।

* অ্যাবিস
আমরা ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস ক্যামেরনের মুভি দ্য অ্যাবিস সম্পর্কে বলছি না, যেখানে গবেষকরা সমুদ্রের গভীরে একটা সভ্যতা খুঁজে পেয়েছিল। রূপালি জগৎ নয়, এবার বিজ্ঞানীরা নতুন সামুদ্রিক জীবনের সন্ধানে বাস্তব জগতের অ্যাবিসে (অতলস্পর্শীয় গহ্বর) প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। এ অ্যাবিসটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩,০০০ থেকে ২০,০০০ ফুট নিচে অবস্থিত। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার নিকট এক মহাসাগরীয় অভিযানে শতশত নতুন প্রজাতি সংগ্রহ করা হয়েছে। এদের মধ্যে একটি কম পরিচিত প্রাণী হলো ফেসলেস ফিশ বা মুখবিহীন মাছ। এ মুখবিহীন মাছটি ১৮৭৩ সালের পর থেকে সাম্প্রতিক অভিযানটির পূর্ব পর্যন্ত দেখা যায়নি। বিজ্ঞানীরা অন্যান্য যেসব বিরল নমুনা সংগ্রহ করেছেন তাদের কয়েকটি হলো স্পাইনি কিং ক্র্যাব বা কাঁটাযুক্ত কাঁকড়া, মাংকি ব্রিটল স্টার, স্মুথ-হেডেড ব্লবফিশ ও ডিপ-সি লিজার্ড ফিশ। কে জানে এ অতলস্পর্শী গহ্বরে আরো কত কি আছে!

পড়ুন : মহাসাগরের ১৪ রহস্য (প্রথম পর্ব)



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ এপ্রিল ২০১৯/ফিরোজ

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge