ঢাকা, শুক্রবার, ৮ আষাঢ় ১৪২৬, ২১ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

দিল্লীর মসনদে মোদী না রাহুল?

অলোক আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২১ ২:২৬:১৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-২১ ২:৩১:০৯ পিএম
Walton AC 10% Discount

অলোক আচার্য: গত ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ভারতের নির্বাচনের সাতটি ধাপ শেষ হয়েছে। এখন অপেক্ষা ভোট গণনা ও ফলাফলের। নির্বাচনী ফলাফলের দ্বারপ্রান্তে এসে বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের লোকসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যেই জানা যাবে ভারতের হাল ধরবেন মোদী না রাহুল গান্ধী। যদিও কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী এর আগে বেশ কয়েকবার বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চান না। তবে বিজেপিকে ক্ষমতা ছাড়া করাই যেখানে বিরোধী জোটের একমাত্র লক্ষ্য সেখানে অন্যান্য দলগুলো রাহুলকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত। এই শেষ দিকে এসে কে কতো আসন পেতে পারে তা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা কল্পনা।

মোদী বলেই ফেলেছেন- দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হতে লোকসভায় যা আসন প্রয়োজন, ছয় দফার ভোটেই তা হাসিল হয়ে গিয়েছে। এমনকি তার দাবি বিজেপি একাই ৩০০-এর বেশি আসন পাবে। এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা অবশ্য পাল্টা কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। ১৯৯৬ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। তারপর ২০০৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে জয়ের ব্যাপক জল্পনা কল্পনা সত্ত্বেও তারা পরাজিত হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদীর দিকে অভিযোগের মূল বিষয় দেশের অর্থনীতি। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি। এই নিয়ে বিরোধী শিবির বারবার মোদীকে আক্রমণ করেছে। রাহুল গান্ধীর মতে নোট বাতিল আর জিএসটির মতো সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে।

লোকসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে কোন বিষয়গুলো প্রভাব বিস্তার করবে? পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা বা নোট বাতিল এসব বিষয় আসলে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করবে। গণমাধ্যমে আভাস আছে এর আগেই বিজেপি সরকারের বিকল্প একটি জোট সরকার গড়তে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিরোধী দলগুলো। তাদের বিশ্বাস এবারের নির্বাচনে বিজেপি ও এনডিএ জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পাবে না। সেক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলো সমঝোতার মাধ্যমে এই বিকল্প জোট সরকার গড়তে পারবে। লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে সরকার গড়তে লাগবে ২৭২ আসন। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে ২৮২টি আসন পেয়েছিল। এনডিএ জোট পেয়েছিল ৩৩৬ আসন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিরোধীরা। ১৯৯৮ সালে বিজেপি পেয়েছিল ১৮২ আসন। এনডিএ জোটের সম্মিলিত শক্তি পেয়েছিল ২৫৪ আসন। সরকার গড়লেও ২০ মাস পর সেই সরকারের পতন হয়েছিল। মোদী ম্যাজিকে ফের বিজেপি নাকি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় আসবে তা নিয়ে জোর গুঞ্জন চলছে। মোদীর ব্যক্তি ইমেজ ভারতের রাজনীতিতে অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই ব্যাপক বেকারত্ব ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অসন্তোষের কারণে এবারের নির্বাচনে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা কম হলেও মোদীর বিপরীতে ভারতীয়রা কাকে বেছে নেবেন বা কার ওপর তাদের ভবিষ্যত দায়িত্ব অর্পণ করতে পারে তা আর কিছুদিনের মধ্যেই জানা যাবে। তবে মোদী বিরোধীদলীয় নেতার চেয়ে এগিয়ে আছেন তা এর আগের বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। বুথ ফেরত জরিপে বিজেপির জয়ের আভাসও পাওয়া গেছে।

২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রধান প্রার্থীর ওপর ফোকাস করে বিগত ৩০ বছরের রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করে বিজেপি। এ নির্বাচনেও তারা মোদীকে ফোকাস করেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইছে। পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলার পর দলটির নেতারা দাবি করেছিল ভারত এখন শক্ত ও নিরাপদ নেতৃত্বের হাতে রয়েছে। সব সমস্যার সমাধান হিসেবে মোদীকেই বেছে নিচ্ছে দলটি। বিজেপির শাসনামলে বৈশ্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তারা মোটামুটি সফল বলা যায়। মহাকাশসহ প্রযুক্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। তারা মূলত মোদী ম্যাজিকেই ভরসা রাখতে চান। বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপিতে মোদী কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এবারের নির্বাচনেও ব্যক্তি মোদীর প্রভাব থাকবে। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তার প্রভাব কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছে। মোদীর সময়ে ভারত যেমন সাফল্য দেখেছে তেমনি কয়েকটি বিষয়ে দুর্বলতাও স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ভারত বিশ্বের ষষ্ঠ অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে এবং চলতি বছর ব্রিটেনকে পেছনে ঠেলে দিয়ে পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে আভাস দিয়েছে। আবার ২০১৯ সালে তাদের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। যা দেশটির কর্মক্ষম লোকের জন্য যথেষ্ট কাজের যোগান দিতে ব্যর্থ হবে বলে বিশ্লেষকদের মত। অথচ বেকারত্ব একটি বড় ইস্যু। ফেব্রুয়ারিতে ফাঁস হওয়া সরকারি এক প্রতিবেদন দেখিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেকারত্বের হার ৬ দশমিক ১ শতাংশ ছিল যা গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকারিভাবে এই প্রতিবেদন কখনোই প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া দারিদ্র্য দেশটির বড় একটি চলতি সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে ভারতের ১৭ কোটি ৬০ লাখ লোক চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল, মাথাপিছু ২ ডলারেরও কম আয়ে তাদের জীবন ধারণ করতে হয়েছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেক দারিদ্রসীমার নিচে রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক শক্তিতে ভারত পূর্বের তুলনায় নিজের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এদিকে আসামের এনআরসি খসড়া প্রণয়ন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। বিরোধীরা এর সূত্র ধরেই মোদীকে কড়া আক্রমণ করছেন। গত বছরের জুলাইয়ে আসামের খসড়া এনআরসিতে ৪০ লাখেরও বেশি নাম বাদ পরে। যাদের এখন নানা হয়রানি ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে। এই ঘটনার পর থেকেই মোদী সরকারের নানা সমালোচনা হচ্ছে। বিরোধীরাও বিভিন্ন সময় মোদী সরকারের সমালোচনা করছেন। ভারতের ভবিষ্যত অর্থনীতির গতি প্রকৃতি, ধর্মীয় সহিঞ্চুতা রক্ষা, তারুণ্যের বেকারত্ব ঘোচানো, নারী সুরক্ষা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়ন এসব বিষয় নির্বাচনে অবশ্যই প্রভাব বিস্তার করবে। জরিপে যাই আসুক ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুই বলা যায় না তা ইতিহাস সাক্ষী। দিল্লীর মসনদে শেষ পর্যন্ত কে বসবেন জানতে ২৩ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ মে ২০১৯/তারা

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge