ঢাকা, সোমবার, ৩ আষাঢ় ১৪২৬, ১৭ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

জেলেদের সুদিন ফিরিয়ে দিন

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২০ ৭:০৯:১১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-০৪ ১:৫৪:৪৭ পিএম
Walton AC 10% Discount

রফিকুল ইসলাম মন্টু: ‘আপনিও ভালো থাকবেন। ভালো রাখবেন উপকূল!’ উপকূলের অনুজপ্রতীম সংবাদকর্মীর সঙ্গে ফেসবুক আলাপের শেষ দু’টো লাইন। এমন কথা শুনলে আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারি না। নিজের অজান্তেই চোখের পাতা ভিজে ওঠে। কেন ওঠে জানি না! প্রতিদিন উপকূলের কোনো না কোনো স্থান থেকে আসে খারাপ খবর। কেউবা সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন- ‘আমরা পনিতে ভাসছি; আপনি ওই প্রান্তে কী করেন?’ কেউ বলেন, ‘কাজকর্ম নেই; আমরা খাবো কী? সরকারকে বলেন।’ কণ্ঠে দাবির সুর। কেউবা অনেকটা ভরসা রেখেই নিবেদন রাখেন- ‘মাছধরায় নিষিদ্ধ সময়টা একটু কমিয়ে দেওয়া যায় না?’ প্রশ্নগুলো শুনি! আমি কী করতে পারি? জানা এবং জানানো ছাড়া আমার কী-ই বা করার আছে? উপকূলের মানুষজন ভালো না থাকলে উপকূল কীভাবে ভালো থাকবে?

এই লেখা যখন তৈরি হচ্ছে তখন ২০ মে ২০১৯-এর প্রথম প্রহর। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁয়ে খানিকটা এগিয়েছে। আজ থেকে উপকূলের জেলেদের জন্য শুরু হলো আরেকটি খারাপ দিন, কষ্টের দিন। জাটকা মৌসুমের দুইমাস অতিকষ্টে কাটানোর পর মাত্র উনিশ দিন মাছ ধরেছেন জেলেরা। মার্চ-এপ্রিল ইলিশের জাটকা মৌসুমে প্রজনন এলাকায় মাছ ধরা বন্ধ ছিল। আর আজ থেকে সমুদ্রগামী মাছ ধরার সকল নৌযান বন্ধ থাকবে। সমুদ্রে কোনো ট্রলার-ট্রলি মাছ ধরতে যেতে পারবে না। এই আদেশ জারি হয়েছে সরকারের তরফে। কোস্ট গার্ড থেকে চিঠি গেছে উপকূলীয় মৎস্য ঘাটগুলোতে, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের কাছে। ১৯ মে এই সতর্কতা পৌঁছেছে উপকূলের অনেক স্থানেই।

উনিশ মে দিবাশেষে অস্তরাগের কোনো এক সময়ে হঠাৎ মোবাইলে রিং বেজে উঠলো। ওই প্রান্তের কণ্ঠ থেকে প্রশ্ন একটাই- ‘২০ মে থেকে সমুদ্রে মাছধরা নিষিদ্ধের ঘোষণা কী আসলেই সত্যি?’ সমুদ্র উপকূলবর্তী ঢালচরের নদীর কিনার থেকে এই প্রশ্নের জবাব জানতে চাইলেন- ওই এলাকার যুবক আবদুর রহমান বিশ্বাস। মেঘনার ভাঙন তার ঘরের পেছনের পুকুরটা ছুঁয়েছে। সেই পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন রহমান। কথার ফাঁকে সামান্য স্মৃতিচারণ: ‘এই পুকুরে উদোম শরীরে গোসল করতে করতে বড় হয়েছি। পুকুরের পাড়ের মাঠে খেলেছি। ভাঙনে সব নিয়ে যাওয়ার সময় সেইসব স্মৃতি ভাসছে মনের পর্দায়। পুকুরের সান বাঁধানো ঘাট, পুকুরপাড়ের ভিটে, নারকেল-সুপারির বাগান, স্বজনের কবরস্থান, বহু পুরানো পরিত্যক্ত নিজেদের স্মৃতি জড়ানো সেই থাকার ঘর- সবই হয়তো এখানে হারাবো।’ মোবাইলের ওই প্রান্তে রহমানের দীর্ঘশ্বাস। কথা শেষে ভাবি- সারাবছর নদী ভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করা এই মানুষগুলো কীভাবে টিকে আছে? হাজারো সংকটের ভিড়ে যখন মাছধরা নিষিদ্ধ হওয়ার নোটিশ আসে, তখন যেন সংকটের মাত্রাটা আরও বেড়ে যায়! সকলের মাথায় হাত ওঠে! নদী ভাঙনের কষ্টের কথা বলতে বলতে ঢালচরের যুবক আবদুর রহমান সে বিষয়টিই উস্কে দিলো। কথা বলার সময় ওর চেহারা না দেখতে পেলেও অনুভব করতে পারি- ওর চোখের পাতা দু’টোও হয়তো এখন ভিজে উঠেছে! হয়তো ওর তখন মনে পড়ছে ছোটবেলার অনেক কথা- পিঠে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে স্কুলে, মাঠে খেলাধুলা কিংবা গরু চড়ানোর কথা! হয়তো মনে পড়ছে দিগন্তজোড়া ফসলি মাঠের কথা- যা এখন আছে শুধু স্মৃতিতে!

সমুদ্রে মাছধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা কানে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভাবনার কেন্দ্রে ঠাঁই নেয় অতি চেনা দ্বীপ ঢালচর। এখানকার অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ মাছধরার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমটা এদের জীবিকা নির্বাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বছরের হাজারো কষ্টের কথা তারা ভুলে যান এই মৌসুমে। প্রতীক্ষায় থাকেন কবে বর্ষা আসবে। মার্চ-এপ্রিলে সকলের দাঁত কামড়ে টিকে থাকা এই বর্ষাকালের প্রতীক্ষায়। প্রতি বছর পহেলা মে থেকে জাটকা নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পরই এখানকার মানুষদের মাঝে ফিরে আসে প্রাণচাঞ্চল্য। ছোট মেয়েটার রাঙা ফ্রকের আবদার, আদরের ছেলেটার জিন্সের ফুল প্যান্টের বায়না, কিংবা সুখে-দুঃখে সংসার টেনে নেওয়া স্ত্রীর দু’খানা ইন্ডিয়ান প্রিন্টের শাড়ির বায়নাটা এই সময়ের জমা খাতায়ই লিখে রাখেন জেলেরা। ঘরের পাতা উড়ে যাওয়া চালাটা ছাওয়া হয়নি, ভাঙা বেড়া আর ঠিক করা হয়নি। এগুলো হবে বর্ষায় হাতে টাকা এলে। বাকি খাতার দোকানি বারবার তাগাদা দিয়ে গেলেও তার জন্য সময় রাখা হয় এই বর্ষায়- কারণ এটাই ঢালচরসহ সমগ্র উপকূলের জেলেদের মৌসুম। নিজের পায়ের ক্ষয়ে যাওয়া হাওয়াই চপ্পলটা ফেলে এবার নতুন একজোড়া চপ্পল হবে কিনা! ছিঁড়ে যাওয়া গামছাটা বদলানো যাবে কিনা! তিন তালি দেওয়া লুঙ্গিটা এবার পাল্টে নেওয়া যাবে কীনা! অভাবকালের জন্য কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারবেন কিনা! জেলেদের এসব চিন্তা থাকে খাতার শেষ পাতায়। কঠোর পরিশ্রমে তাকে টিকে থাকতে হয়। বর্ষার জন্য থাকে তার সকল প্রস্তুতি। কিন্তু এবার সেসবের কী হবে?

উপকূলীয় দ্বীপ ঢালচর আমার মুখস্ত। প্রায় করতলের মতই চেনা। যখন শুনি, পশ্চিম ঢালচরের হাইস্কুলের পেছন পর্যন্ত ধেয়ে এসেছে ভাঙন তখন আর আমার অনুমান করতে কোনো অসুবিধা হয় না। আমি হয়তো আগ বাড়িয়ে জানতে চাই- ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটা, কিংবা আনিস স্যারের বাড়িটা এবারের বর্ষায় টিকবে তো! কী যত্ন করেই না ঢালচরের সকলের প্রিয় আনিস স্যার একখানা বাড়ি করেছেন! সবুজ রঙ করা টিনে ঘরখানা অনেক দূর থেকেই চোখে পড়ে। সেবার দেখে এসেছিলাম আনিস স্যারের ঘরের সামনে ফুটে আছে অগনন ম্যাজেন্ডা রঙের বনফুল। প্রচণ্ড গরম। ঘরের সামনের দরজা থেকে বাতাস ঢুকে প্রস্থান হচ্ছিল পেছনের দরজা দিয়ে। ঘরের পেছনের বারান্দায় চেয়ারে বসে যে গাছের ডাবের পানি দিয়ে পিপাসা নিবারণ করেছিলাম সেদিন, সে গাছটি এ বর্ষায় টিকবে কিনা আমি জানি না! আনিস স্যারের ঘরের পেছনে, আরও নদীর কিনারের দিকে কালু ভাইয়ের গাছের মিষ্টি আম গাছগুলোর পরিণতি কী হবে আমার জানা নেই! এই গাছের আম বিক্রি করে কালু ভাই যে টাকাগুলো পেতেন, তা সংসারকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করতো। মনে আছে, ভর দুপুরে আমাদের খাওয়ার জন্য উঠোনের চেয়ার টেবিলে যখন কয়েকটি পাকা আম কেটে প্লেটে দিয়েছিলেন, তখন কালু ভাইয়ের আম গাছে বাজছিল টিনের আওয়াজ। গাছের আম রক্ষায় কাকপক্ষিকে জুজুর ভয় দেখানোর আওয়াজ। কালু ভাইয়ের বাড়ি থেকে আরও খানিক নদীর কিনারে থাকতেন রঙমেহের-মোমেনারা। রঙমেহের আগেই চলে গেছেন দ্বীপ ছেড়ে; হয়তো মোমেনা বেগমও ইতিমধ্যে দ্বীপ ছেড়েছেন।

কথায় কথা আসে। এত কথা বলতে হয় কারণ, এই বিষয়গুলোর সঙ্গেই ঢালচরের মানুষের বেঁচে থাকা। এখন তো নদীও ভাঙছে, আর মাছধরা নিষিদ্ধ থাকায় কপালও পুড়ছে সকলের। যে বর্ষা তাদের জন্য ছিল অপেক্ষার, সে বর্ষা এখন তাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন শুধু বর্ষাকালের চিন্তা নয়, একই সঙ্গে এখন চিন্তা পরের মৌসুমেরও। মানে বর্ষার রোজগারে পরের মৌসুম পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ আর থাকছে না এখানকার মানুষদের। ভাঙনের কারণে বহু মানুষ ঢালচর থেকে অন্যত্র চলে গেছেন। এখনও যারা যেতে পারেননি, তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ জীবিকার টানেই এখানে থেকে গেছেন। আর জীবিকার সেই মাধ্যম মাছ ধরা। মাছের কিছু ব্যবসা আছে, কিংবা ছোটখাটো অন্য ব্যবসা বাণিজ্য আছে- বর্ষাকালের রোজগারে তাতেই পরের মৌসুম চলার ব্যবস্থা হয়ে যায়। বর্ষায় মাছের মৌসুমকে ঘিরে ঢালচরের মাছঘাটে হাজারো মানুষের ভিড় জমে। জাল মেরামত (স্থানীয় ভাষায় জাল তোনা), ট্রলারে আলকাতরা লাগানো, ট্রলার ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ঠিকঠাক করা, এমনকি খাবার দোকান, চায়ের দোকান, মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, চুলকাটার সেলুন পর্যন্ত- সবাই চেয়ে থাকেন এই বর্ষা মৌসুমের দিকে। ঢালচরের প্রাণকেন্দ্র হাওয়াদার বাজারের জান্টু ভাইয়ের হোটেলের ব্যবসা পুষিয়ে নিতে প্রতি বছর একবার বর্ষা মৌসুম আসতেই হয়। অন্য মৌসুমে দোকানে গ্রাহক থাকে না। আর বর্ষায় সেখানে লেগে থাকে ভিড়। ব্যবসায় মন্দা গেলে আলমগীর-রাজিব-সাকিবদের মত হোটেল শ্রমিকদের পেটেও তিনবেলা খাবার জোটে না। কাপড়ের দোকানে ভালো বেচাকেনা না হলে ব্যবসায় ভাটা পড়ে। যে কিনা ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদারী করার পর বাড়তি সময়ে টেইলারিংয়ের কাজ করে রোজগারের আশায়। এমন আরও অনেকজনের নাম বলা যায়। তবে সবকিছুর মূলে কথা ওই একটাই- জেলেদের রোজগার। জেলের রোজগার হলে চা দোকানে বিক্রিবাট্টা হবে, খাবার দোকানের আড্ডায় আসবে পুরি, ফিরনি, জামাই পিঠা, জিলাপি, বালুশা, নিমকি, ছোলাবুটসহ আরও কত কী! বর্ষা এলে গরু কাটা হবে- ঘোষক বাবুল ভাই তখন সন্ধ্যা হলেই বাজার মাতিয়ে তুলবেন মাইকের আওয়াজে- ‘অমুক দিন অমুক সময়ে গরু জবাই হবে। সবাই চলে আসবেন।’ জেলেদের আয়-রোজগার ভালো হলে ভাসমান ব্যবসায়ী দুলাল মিয়ার চুড়ি-ফিতা-আংটির ব্যবসটাও ভালো যাবে। সন্ধ্যায় টাকাভর্তি পকেটে কিশোর-যুবকেরা কিনবে লাল-নীল আংটি। আর হাওলাদার বাজারের খোলা প্রান্তর জুড়ে ক্যানভাসারের ওষুধ বিক্রির তাঁবুটা টাঙানো থাকবে আরও কয়েকটা দিন। মালামাল আর মানুষে বোঝাই লঞ্চ (এলাকার মানুষ যাকে ‘সার্ভিস’ বলে) সন্ধ্যায় ঘাটে ভিড়বে, রাতটুকু অবসরে থেকে আর ঢালচর ছেড়ে যাবে সকালে। লঞ্চের কেরানির সামনের জায়গাটুকুও তখন ভরে উঠবে মালামালে। কচ্ছপিয়া ঘাটে ভিড়তে ভিড়তে কেরানির ব্যাগ ভরে যাবে টাই। সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাছধরা। কিন্তু এবার বর্ষায় কী দৃশ্য দেখবে ঢালচর! হতাশার-কষ্টের এক কাল্পনিক চিত্র ভেসে ওঠে হৃদয়ের ক্যানভাসে। নিশ্চয়ই জেলেদের রোজগারে ভাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের রোজগারেই ভাটা পড়বে।

ঢালচর একটা উদাহরণ মাত্র। বর্ষায় সমুদ্রের মাছের ওপর নির্ভরশীল এমন এলাকা আছে উপকূলের অনেক স্থানেই। বড় বড় ঘাট। বহু মাছধরার ট্রলারের ভিড়। সপ্তাহ দু’য়েকের সংবাদ মাধ্যম অনুসরণ করলে এ বিষয়টি সকলের কাছেই স্পষ্ট হবে। অনেক স্থান থেকেই জেলেদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ উঠেছে। মানববন্ধন, সভা, সংবাদ সম্মেলন অনেক কিছুই করেছেন তারা। খুলনায়, সাতক্ষীরায়, বাগেরহাটে, শরণখোলায়, বরগুনায়, পটুয়াখালীতে, কুয়াকাটায়, ভোলায়, চট্টগ্রামে, কক্সবাজারে- কোথায় হয়নি প্রতিরোধ। সবাই একই সুরে বলছে, ‘ভরা মৌসুমে মাছধরায় এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা না হলে জেলেরা বাঁচবে না। মাছ ধরার এই প্রধান মৌসুমে সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ রাখলে জেলেরা নতুন করে সংকটে পড়বেন। আর যারা এই খাতে পুঁজি বিনিয়োগ করছেন, তাদেরও সংকটের শেষ থাকবে না।’ পূর্ব-উপকূলের টেকনাফ থেকে পশ্চিম উপকূলের শ্যামনগর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে কয়েক লাখ জেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। মৌসুম আসার আগে অনেকদিন ধরে চলতে থাকে তাদের প্রস্তুতি। ঋণ নিয়ে কিংবা দাদন নিয়ে অনেকে ট্রলার প্রস্তুত করেন। সমুদ্রগামী ট্রলারের সাইজ ভেদে ১০-১৫ লাখ থেকে শুরু করে ৮০-৯০ লাখ কিংবা তারও বেশি টাকা খরচ হয় মাছ ধরার প্রস্তুতিতে। অন্যান্য বারের মত এবারও প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন সকলেই। এখন উপায় কী হবে! নিষেধাজ্ঞা তো জারি আজ থেকেই। এখন তিনটি সংকট যুক্ত হলো- ১) দাদন এবং ঋণ শোধ; ২) বর্ষাকালে জীবিকা নির্বাহের জন্য নতুন করে ধারদেনা করা; এবং ৩) বর্ষার পরে বাড়তি টানাপোড়েন।

বাগেরহাটের শরণখোলার রাজৈর এলাকার এফবি খায়রুল ইসলাম ফিশিং ট্রলারের মালিক জাকির হোসেন, এফবি আট ভাই ফিসের মালিক আনোয়ার হোসেন, এফবি মায়ের দোয়ার মালিক রফিকুল ইসলাম ও এফবি জিসানের মালিক মনির হোসেনসহ অন্যান্যরা জানান, সরকার এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করলে জেলেরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে চরম বিপাকে পড়বেন। শরণখোলা উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব রফিকুল ইসলাম কালাম ও শরণখোলা উপজেলা মৎসজীবী সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন জানান, এটি সরকারের একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। হঠাৎ এরকম সিদ্ধান্তে উপকূলের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এ সময়ে ভারতসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের জেলেরা বঙ্গোপসাগর থেকে সকল প্রকার মাছ ধরে নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি সরকারকে পুনর্বিবেচনার করার দাবি জানান তারা। বিষয়টি নিয়ে উপকূলের যেসব জেলের সঙ্গে কথা বলি- সকলের বক্তব্য প্রায় একই রকম।

সমুদ্রে মাছধরায় নিষেধাজ্ঞার এ আইনটি আসলে বহু পুরনো। ১৯৮৩ সালের। সে সময় এ নিয়ে তেমন প্রতিবাদ হয়নি। কারণ ওই আইনে কেবল ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিংয়ের’ কথা বলা হয়েছিল। সমুদ্রে মাছ ধরায় নিয়োজিত আধুনিক ট্রলার সজ্জিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিংয়ে ব্যবহৃত জালের ফাঁস খুবই সূক্ষ্ম। ছোট রেণু পোনা থেকে শুরু করে সেসব জালে ধরা পড়ে সব বড় মাছ। আইন অনুযায়ী ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং বাধাগ্রস্থ হলে সমুদ্রে ইলিশ জেলেদের মাছ ধরতে কোনো অসুবিধা হতো না। ইলিশ জেলেরা যে জাল ব্যবহার করে তার ফাঁস কমপক্ষে ৪ বর্গ ইঞ্চি। এই ফাঁসে রেণু পোনা আটকানোর সুযোগ নেই। সমুদ্রে মাছধরারত ইলিশ জেলেদের এই জটিলতার শুরু ২০১৫ সাল থেকে। ওই বছর আইনের সংশোধন করা হয়। এতে বলা হয়, কেবল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং নয়, টানা ৬৫ দিন সমুদ্রে সব ধরনের মাছ শিকার বন্ধ থাকবে। সংশোধনকালীন বছর ২০১৫, কিংবা তার পরের বছরগুলোতে এ নিয়ে কোনো জটিলতা দেখা দেয়নি। জেলেরা সমুদ্রে নির্বিঘ্নে মাছ ধরতে পেরেছে। কারণ এই সময়ে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হয়নি। চলতি বছর আইনের কঠোর প্রয়োগের সিদ্ধান্তই জেলেদের হতাশার কারণ।

ঢালচরের হতাশ যুবক আবদুর রহমান বিশ্বাসের কথায় আসি- তার শেষ লাইনটি ছিল: ‘এই কঠোর সিদ্ধান্ত কী সরকার বাস্তবায়ন করবে? মনে হয় শিথিল হবে!’ ওর কণ্ঠে আশাবাদ। আমারও আশা এই সংকটের উত্তরণ ঘটাবে। জেলেদের হতাশা কাটাতে হবে। জেলেদের ভালো রাখতে হবে। জেলেরা কাজ পেলো কিনা, মাছ ধরতে পারলো কিনা, স্বাভাবিকভাবে জীবন চালিয়ে নিতে পারলো কিনা, বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে, এটা থাকবে, ওটা থাকবে- এ কথা বহুবার আমরা শুনেছি। এপ্রিল-মে মাসে জেলেদের পুনর্বাসন সহায়তার চিত্র প্রায় সকলের কাছেই স্পষ্ট। সে প্রসঙ্গ না হয় এখানে না-ই বা টানলাম। জেলেরা ভিক্ষা চান না। তারা কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করতে চান। আইন শিথিল করে জেলেদের সমুদ্রে ধরতে দিন, অথবা বিকল্প কাজের সুযোগ বের করুন- যাতে জেলেদের দিন ভালো যায়। জেলেদের দিন ভালো গেলে আরও অনেক পেশার মানুষের জীবিকার পথ সুগম হবে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২০ মে ২০১৯/তারা

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge