ঢাকা, বুধবার, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬, ২৬ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে

অভিজিৎ মুখার্জি : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-১৭ ১২:৩৮:২৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-০৪ ১:৪৯:১৯ পিএম
Walton AC 10% Discount

আপিস কাছারিতে ভারতের সর্বত্র পশ্চিমী গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারই ব্যবহার হয়। যথেষ্ট প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও, অনুমান করছি বাংলাদেশেও সেটাই হয়, নইলে ভাষাদিবস ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ বলে চিহ্নিত হতো না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তার সঙ্গে পয়লা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ এরকম দুটো তারিখের কথাও জনপরিসরে উচ্চারিত হয়, এরা বাঙালি কালচারের সঙ্গে জড়িত। বাঙালি সংস্কৃতি জিনিসটা ঠিক কী, সেটা একটা জটিল প্রশ্ন, কাউকে জিজ্ঞেস করে বসলে এই জটিলতা হেতু ভেতরে ভেতরে চটে যাবে, কিন্তু বাঙালির যে একটা সুউচ্চ কালচার আছে এটা খুব প্রীতিপ্রদ একটা প্রসঙ্গ, চোয়াল শক্ত করে, চোখের মণি স্থির রেখে বলে দেখবেন কোনো আড্ডায়, দেখবেন আপনা থেকেই অনেকের আঙুলটা একটু নড়ে উঠবে লাইক দেয়ার ইচ্ছেয়, এটা যে বইয়ের (ফেসবুকের) বাইরে মুখোমুখি সাক্ষাতে বলা হচ্ছে সেটা খেয়াল করে অগত্যা নিরস্ত হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি যখন ‘নববর্ষ’ কথাটা উচ্চারণ করে, তার মধ্যে ‘নব’ কথাটার চেয়ে ‘বর্ষ’ কথাটার গুরুত্ব অবচেতনে অনেক বেশি থাকে- যাক, আরেকটা বছর কাটিয়ে দেয়া গেল, এহেন তৃপ্তি অজানিতে মনটাকে ক্ষণিকের জন্য আলোকিত করে চলে যায়। যত কুৎসিতভাবেই হোক, যত গ্লানি সহকারেই হোক, যত ক্লেদাক্তই হোক, বেঁচে থাকার বিকল্প কিছু আছে নাকি? একটা গল্পে ছিল, শিব্রামকে তার বাবা নাকি ডেকে বলেছিলেন, ‘ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া না করলে বাঁচবি কী করে, আর না বাঁচলে খাবি কী?’ বাঙালি অবশ্য না বাঁচলেও মাছ খাবে, কিন্তু বেঁচে থাকলে তার সঙ্গে আছে ফেসবুক, তৃণমূল-সিপিএম-বিজেপি, চায়ের দোকানে বসে অবক্ষয়ী পুঁজিবাদ ও প্রগতিশীল সমাজতন্ত্রের ভাগ্যবিধাতা হওয়া, একশ দিনের কাজের প্রকল্পের অঢেল উপার্জন, আরো কত কী! সুতরাং বাঙালি বাঁচতে চায় বলেই ঠিক করেছে। আরেকটি প্রভাতের ইশারায়, অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।

উৎসব উদযাপন করা হয় ঠিকই, কিন্তু উদযাপিত হলেই তা উৎসব নয়। বিশেষ করে যদি বছরের একটা নির্দিষ্ট তারিখ ধার্য হয়ে থাকে উদযাপনের জন্য, তাহলে আজকের বাঙালি সেই উপলক্ষ্যের প্রতি দৃকপাতই করবে না। তাই পয়লা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপনের উপলক্ষ্যটার গুরুত্ব ক্রমেই কমবে; এখনই আর তেমন কিছু নেই। কারণটা বুঝিয়ে বলছি। বাঙালি ‘ওয়র্ক’ বিশেষ পছন্দ করে না, ওটা যে তার ডিএনএ-তে নেই, ইংরেজ ভারত ছাড়ার পর কয়েক বছরেই তা বোঝা গেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘সভ্যতার সংকট’ বক্তৃতার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ভি এস নাইপল লিখেছিলেন যে, বেঁচে থাকলে কবি দেখতে পেতেন কীভাবে ইংরেজ চলে যাওয়ার পরে কয়েক বছরের মধ্যেই কবির নিজের শহর একটি ভুতুড়ে শহরে রূপান্তরীত হয়েছিল। বাঙলার বাইরে থেকে এসে বহু শাসক এতদিন বাঙালিকে দিয়ে অনেক খাটিয়ে নিয়েছে, বল্লাল সেন ফেন, ধর্মপাল টাল, হুসেন শাহ, ইংরেজ তো বটেই, ইংরেজ আসার আগে দক্ষিণবঙ্গে পর্তুগীজরা, আপদ বালাইয়ের শেষ ছিল না, কিন্তু আধুনিক যুগ গণতন্ত্রের যুগ, এখন সে নিজেই নিজের শাসক, এবার বাঙালি আয়েশ করবে। মুজতবা আলীর সেই গল্প: দোকানদার দুপুরে দোকানেই একটু ঘুমুচ্ছে, কোত্থেকে অলপ্পেয়ে খদ্দের এসে বলছে, সে সাবান কিনতে চায়। কোনোরকমে চোখের পাতা একটু ফাঁক করে তাকে বলতেই হলো যে, ‘সাবান নেই’। কিন্তু আপদ তবু যায় না। বলছে, ‘কই, ওই তো দেখা যাচ্ছে সাবান, ওই যে সবুজ মোড়কে।’ ঘুমে ঢলে পড়ার আগে দোকানদারকে বলতেই হলো, ‘ও সাবান বিক্কিরির নয়।’


যা চক্রবৎ পুনরাবৃত্ত হচ্ছে, তার মধ্যে নতুন কিছু খোঁজার যুক্তি কী? বছর যখন ঘুরে ঘুরে আসেই, ঋতুক্রম পুনরাবৃত্ত হয়, তার মধ্যে একটা নির্দিষ্ট কোনো দিনকে নতুন দিন বলার প্রকৃতপক্ষে কোনো যুক্তি নেই, যদি না ঐ দিনটাকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি জীবনের গুণগত মানের হেরফের ঘটানোর বাঞ্ছাকে একটা নতুন মাত্রার জেদের ওপর স্থাপিত করার দিন হিসেবে।


কেউ বলে খ্রিষ্টের জন্মের আগেই, সেই বিক্রমাদিত্যের সময় থেকেই উত্তর-ভারতে ফসল ঘরে ওঠার পরে বৈশাখী উৎসব উপলক্ষে বছরের এই দিনটি উদযাপন করার রীতি, সেই অনুযায়ী বঙ্গাব্দের হিসেব রাজা শশাঙ্কের আমলে চালু হয়েছিল। কেউ বলে সম্রাট আকবরের আমলে প্রবর্তিত হয়েছিল বাংলায় বৈশাখ দিয়ে বছর শুরুর সৌর-চান্দ্র ক্যালেন্ডার, ফসল কাটা সম্পন্ন হলে কর সংগ্রহের হিসেবে সুবিধের জন্য। চাষাভুষোর ফসল কাটা, রাজস্ব কর, কলকাতায় অত বড়ো একটা নবজাগরণের পরও এইসব উদযাপন করবে নাকি আধুনিক স্বাধীনচেতা বাঙালি, সে কি আর পাঁচটা সংস্কৃতিহীন, বিষয়আশয়ে আসক্ত জনগোষ্ঠীর মতো নাকি? নেহাত কয়েকটা গান লেখা হয়ে গিয়েছিল, ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক’, ‘এসো হে বৈশাখ’, ক্ষেমাঘেন্না করে সংস্কৃতিতে স্থান দিয়েছিল দু’চার প্রজন্ম আগের বাঙালি। ঐ দিনে নাকি ‘হালখাতা’ উপলক্ষে আগে আগে মুফতে মিষ্টির প্যাকেট দিত চেনা দোকানে গেলে। ‘মুফতে’ কথাটার একটা মর্যাদা আছে না? আজও বলতে গিয়ে চোখটা উদাস হয়ে সুদূরে নিবদ্ধ হয় প্রবীণদের। এখন ওসবের দিন আর নেই, যুগ পালটে গেছে।

এবার আসল কথাটায় আসি। ‘ওয়র্ক’ ভালো না লাগলে কী হয়, ‘ওয়র্কিং ক্লাস’ বাঙালি মানসে প্রবাদপুরুষ। ওয়র্ক নেই অথচ ওয়র্কিং ক্লাস আছে, সেটা কীরকম? না থাকলে সৃষ্টি করে নিতে হবে- সোজা হিসেব। বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন না, ‘ঈশ্বর না থাকিলেও ঈশ্বর সৃষ্টি করিয়া লওয়ার প্রয়োজন আছে মানুষের?’ অপরিচ্ছন্ন পোশাক আশাক, অপরিচ্ছন্ন ভাষা, অস্বাস্থ্যকর জীবনধারণের আভাস, সঙ্গে মারমুখী আমোদপ্রিয়তা দেখলেই ওয়র্কিং ক্লাস। এই ওয়র্কিং ক্লাসের সংস্কৃতি আর ওয়র্ক ঠেকিয়ে রাখার অর্থনীতি, উভয়ে মিলে আজকের পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক জীবন ও সংস্কৃতি। অতএব উৎসব লাগবে, তিনশ পঁয়ষট্টি দিনই উৎসব লেগে থাকলে সবচেয়ে ভালো। দুর্গাপুজোর সাতদিন আগে থেকে দুর্গোৎসব শুরু হয়ে কালীপুজো পর্যন্ত, তারপর জগদ্ধাত্রী, ইতু, শীতলা, কিছুদিন যাবত পাশের রাজ্য থেকে আমদানি করে ছট, একসময় কার্তিক, সরস্বতী, গণপতি বাপ্পা, কোন তিথিতে যেন নীলের পুজো, পয়লা মে লালের। যে কোনোদিন শুরু করা যায়, পুজোর তিথি পেরিয়ে গেলেও মাইক টাইক বাজিয়ে যাওয়া যায় মণ্ডপে, তারপর জম্পেশ করে লরীতে প্রতিমা তুলে, সঙ্গে পনেরো গজের মধ্যে এলে সুস্থ মানুষ পাগল হয়ে যাবে কিংবা মূর্ছিত হয়ে লুটিয়ে পড়বে এমন ভল্যুমে বক্স অ্যামপ্লিফায়ারে ঢিকিচাকা ঢিকাচাকা মিউজিক চালিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে পাড়া বেপাড়া পরিক্রমা করে গিয়ে বিসর্জন দিয়ে এলেই হবে। এই পুরো সময়টা লরীর আগে পিছে গোল গোল জটলা তৈরি করে নারী ও পুরুষের মধ্যে বেলেল্লাপনার প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া। সাবল্টার্ন ধ্বক বলে কোনো কথা নেই? বাকি ভারত পুঁজিবাদের খপ্পরে পড়ে সকাল বিকেল অফিসে কারখানায় কাজ করুক, বাংলায় বঞ্চিত শোষিত মানুষ জেগেছে, বুঝতে পেরেছে যে তারা চ্যাম্পিয়ন সাবল্টার্ন। ইংরেজ আমলে মিলিটারির জুনিয়র অফিসারদের বলা হতো সাবল্টার্ন, এখন জুনিয়র শ্রেণিযোদ্ধারা সাবল্টার্ন, মাঝারিরা ইংরেজি খবরের কাগজে পোস্ট-এডিটোরিয়াল লেখে, আর সিনিয়র শ্রেণিযোদ্ধারা বেশিরভাগ সময় বিদেশে থাকে, তাঁদের ‘কলমবেয়ে’ বিশ্ববিদ্যার বাণী কখনো সখনো বাঙালিকে সিঞ্চিত করে, বাঙালির আত্মতর্পণ হয় তাতে। কথা হচ্ছে, এই যেখানে উদযাপনের শর্ত, সেখানে অমন তারিখ বেঁধে দিলে চলে? চৌদ্দোই ফেব্রুয়ারি, পয়লা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ, দিনের দিন এসে ঐদিনই শেষ। ওসব উদযাপনের তাই কৌলিন্য নেই, বাঙালির অদেখা চিরশত্রু বুর্জোয়াদের জন্য ওসব।   তা’ বলে কি সরকারি ছুটির দিনটা বৃথা যায়, একটু অন্যরকম কিছু করা হয় না? ‘অন্যরকম’-এর আবেদন সেই রেনেসাঁর সময় থেকে অপ্রতিরোধ্য। বাঙলায় যা কিছু শ্রেষ্ঠ লেখালেখি হয়ে ওঠার দাবি রাখতে পারে, তাকে নির্দিষ্ট করে কিছু নয়, স্রেফ ‘অন্যরকম’ হতে হয়। সব আশঙ্কা তুচ্ছ করে বাঙালি মেয়ে বেকার সহপাঠী কিংবা নেশারু সিনিয়র দাদাকে জীবনসঙ্গী করে ফেলে, সবাইকে বলে, ‘ও তো একটু অন্যরকম’। কীভাবে পয়লা বৈশাখের দিন সেই অন্যরকমের আয়োজন করা যায়, সেখানেও এখন আর অনিশ্চয়তা কিছু নেই, দুপুরে ঘুমিয়ে, বিকেলে মিউজিক চালিয়ে দিয়ে ইয়ারদোস্তরা জগৎবীক্ষায় বসে, সামর্থ্যে যেমন কুলোয় তেমন কোনো ব্র্যান্ডের দ্রব্যগুণে আবিষ্ট হতে। আড়চোখে সক্কলে নজর রাখে অন্যেরা যেন তার নিজের থেকে বেশিবার ঢেলে, বা বেশি ঢেলে নিয়ে তাকে ঠকাতে না পারে। সঙ্গে মিউজিক চলতে থাকে।

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে নানা বিবর্তনের পরে কলকাতায়, শহরতলীতে, মিউজিক জিনিসটা একটা স্থিতি পেয়েছে। এখন ওসব চাঁদ, ফুল, নদী, বিরহ মার্কা কাঁদুনীর কাব্যগীতি অচল হয়ে গেছে বাড়ির ভিতরে, এখন যেটা সবাই শোনে ব্যক্তিগত পরিসরে, বিশেষ করে নব্য প্রজন্ম, তা একটু দূর থেকে শুনলে কেবল গুমগুম করে ড্রামের আওয়াজ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। আমার পাশের ফ্ল্যাটের ব্যাংকের কেরানি থেকে শুরু করে গুদামের মাল নিতে এসে আমার বাড়ির সামনে দাঁড় করানো ম্যাটাডোরের পাঁচফিট উচ্চতার ড্রাইভার, সবাই শোনে শুধু ঐ গুমগুম, গুমগুম। নিয়ম করে শুনলে ওতে একটা অন্য উপকার হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রেগানকে ডাক্তার বলেছিল জেলি বীনস চিবোনোর অভ্যাস ত্যাগ করতে। একটা নির্দিষ্ট ছন্দে দাঁতে দাঁতে লাগলে মস্তিষ্কে যে ওঠাপড়াহীন ধাক্কাটা পৌঁছতে থাকে তাতে নাকি মস্তিষ্ক কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে, বুদ্ধির সূক্ষ্মতা কমে যায়। সেই একই ফল নাকি হয় ওরকম গুমগুম গুমগুম আওয়াজ কানের ভিতর দিয়ে এসে মাথায় লাগতে থাকলে। ঘরে বাইরে স্বাস্থ্যের, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের, চারপাশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের নির্ভরশীলতায়, আজ নাগরিকের যে অবস্থা কলকাতায় কি পশ্চিমবঙ্গের অন্যত্র, তাতে মগজের সুইচ অফ না থাকলে টেকা কঠিন। আপনারা কী ভাবছেন, নববর্ষ উপলক্ষে বাঙালি ঘরে ‘এসো হে বৈশাখ’ কিংবা ‘বৈশাখ হে, মৌনী তাপস’ বাজে? ইংরেজি ভাষার সঙ্গে আজকের বাঙালির সম্পর্কের একটা নতুন বোঝাপড়া হয়েছে। তার ভোকাবুলারি অর্থাৎ শব্দভাণ্ডার বিবিধ দিকে বেড়েছে কারণ মিডিয়ার সঙ্গে সংস্পর্শে থাকলেই তা অনায়াসে সম্ভব। কিন্তু ভাষার ব্যাকরণ স্কুল কলেজে ক্লাসে বসে শিখতে হয়। স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে একবার ঘুরে দেখে গেলেই বুঝবেন সেই পরিস্থিতির কী হাল। ফলে ইংরেজি ভালো পারে না বলে সর্বভারতীয় চাকরিতে প্রবেশের যে করুণ চিত্র তার উলটো দিকে মোহিত করে দেয়ার মতো ভাষা ব্যবহারের নমুনাও ততটাই উজ্জ্বল। এই সেদিনই অবসরপ্রাপ্ত এক অধ্যাপকের মুখে শুনলাম, মণ্ডপে রবীন্দ্রসংগীত বাজছিল বলে নব্য তরুণী কী অপরিসীম বিরক্তিতে বলে উঠেছিল, এই ‘ডেথ চ্যান্ট’ গানের নামে আর কদ্দিন চলবে!

পঃবঙ্গে এখন ছাত্র মানে ছাত্রশক্তি। অন্যত্র থেকে আসা এক অধ্যাপিকা কলকাতায় ঢোকার পথে তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেসবুকে স্টেটাস আপডেটে লিখেছেন:

‘Mind boggling traffic jam on BT Road as well as Cassipore road from 12 PM to 10 PM. Basantosav at …U! What was essentially a University festival comes down to the streets and if these thousands are students all, I wonder how does …U accommodate such numbers in classes. Can't keep your festival(?) within your campus, babusonas and mamonis? Must you make a spectacle of Higher Education with your ullash? And what is the ullash about, pray? But I already know the answer. Chop, festival cholche!’

[দুপুর বারোটা থেকে রাত দশটা অবধি বিটি রোডে আর কাশীপুর রোডের ট্র্যাফিক জ্যাম দেখে কেমন যেন লাগছে। অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্তোৎসব! যেটা ছিল একান্তই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎসব, সেটা এখন রাস্তায় নেমে এসেছে, আর এই হাজারে হাজারে ছাত্রছাত্রী যদি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী হয়, ভেবে পাচ্ছি না এদের ক্লাসরুমে স্থান সঙ্কুলান হয় কীভাবে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবুসোনা আর মামণিরা, উৎসবটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দির মধ্যে রাখা যায় না? এরকম উল্লাস দিয়ে উচ্চশিক্ষার একটা চোখধাঁধানো প্রদর্শনী কি না করলেই নয়? আর অনুগ্রহ করে বলবে, উল্লাসটাই বা কীসের জন্য? কিন্তু উত্তরটা তো আমি ইতোমধ্যে জানিই। চোপ্‌, উৎসব চলছে!]

যা চক্রবৎ পুনরাবৃত্ত হচ্ছে, তার মধ্যে নতুন কিছু খোঁজার যুক্তি কী? বছর যখন ঘুরে ঘুরে আসেই, ঋতুক্রম পুনরাবৃত্ত হয়, তার মধ্যে একটা নির্দিষ্ট কোনো দিনকে নতুন দিন বলার প্রকৃতপক্ষে কোনো যুক্তি নেই, যদি না ঐ দিনটাকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি জীবনের গুণগত মানের হেরফের ঘটানোর বাঞ্ছাকে একটা নতুন মাত্রার জেদের ওপর স্থাপিত করার দিন হিসেবে। কিন্তু বাঙালির আর কোনো জেদ নেই। শিক্ষায়, অর্থনীতিতে, রাজনীতিতে, স্বাস্থ্যে, সংস্কৃতিতে, নৈতিকতার মানে, সামাজিক বন্ধন বজায় রাখায়, সর্বত্র সে শোচনীয়ভাবে পরাজিত, অসফল। তার কোনো স্বপ্নের হদিস জানা নেই। উনবিংশ শতকের সমৃদ্ধিতে সে ফিরতে পারবে না, ইংরেজের অভিভাবকত্ব সে হারিয়েছে, আধুনিক পৃথিবীর জটিল অর্থনৈতিক উদ্যম তার অনায়ত্ত, প্রবৃত্তিবিরোধী। সে অবচেতনে বিলুপ্ত হয়ে যেতে প্রস্তুত, আর তাই বাহ্যত প্রাণের প্রমাণ রাখতে মরিয়া রকম উৎসব লোলুপ। অস্তিত্বের গুণগত মানের হেরফের ঘটানোর কোনো উদ্যম তার নেই, তাই নববর্ষও তার কাছে আদতে অর্থহীন।





রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ এপ্রিল ২০১৯/তারা 

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge